Five weeks, five cities, a broken heart - and a title for Spain

Five weeks, five cities, a broken heart - and a title for Spain
পাঁচ সপ্তাহ, পাঁচটা শহর, একটা ভাঙা হৃদয় — তৃতীয় ও শেষ পর্ব
The Operator's Edge  ·  তৃতীয় ও শেষ পর্ব · বিশ্বকাপ ২০২৬
মুস্তাফিজুর রহমান সাজিদ  ·  একজন নিষ্ঠাবান ব্রাজিল সমর্থকের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সমাপ্তি

পাঁচ সপ্তাহ, পাঁচটা শহর, একটা ভাঙা হৃদয় — এবং স্পেনের শিরোপা

বিশ্বকাপ ২০২৬ শেষ হয়েছে। পাঁচ সপ্তাহে যা হলো তার সারসংক্ষেপ: আনন্দ, বেদনা, বিতর্ক, পাঁচ শহরে দৌড়াদৌড়ি, রোনালদোর চোখের জল, আর্জেন্টিনার বিতর্কিত উত্থান, এবং স্পেনের ফেরান টোরেস — যিনি অতিরিক্ত সময়ে একটি গোল করে বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষকে পরম আনন্দে এবং বাকি অর্ধেককে চিরন্তন শোকে ডুবিয়ে দিলেন।

~১৮০০ শব্দ
৭ মিনিট পড়া
রম্যরচনা · বিশ্বকাপ ২০২৬ · সমাপ্তি পর্ব

পাঁচ সপ্তাহ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন পাঁচ সপ্তাহ বারবার আসে না। জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটা সমান্তরাল মহাবিশ্বে বাস করে — যেখানে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা ছাড়া বাকি সব দেশের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু সেটা প্রাসঙ্গিক নয়। অফিসের সভায় ডেটা প্রেজেন্টেশন চলে, কিন্তু মনে গোল কাউন্টার চলে। বিয়ের অনুষ্ঠানে পোলাও খাওয়া হয়, কিন্তু ফোনের স্ক্রিন টেবিলের নিচে রাখা থাকে। এটা ফুটবল বিশ্বকাপ। এবং এবারের বিশ্বকাপ, ঈশ্বর সাক্ষী, সহজ ছিল না।

প্রথম পরিচ্ছেদ

পাঁচ সপ্তাহের আবেগের ম্যাপ — যা কোনো কম্পাসে ধরা যায় না।

বিশ্বকাপের পাঁচ সপ্তাহে বাংলাদেশের একজন গড় ফুটবল দর্শক গড়ে নয় কেজি ওজন হারান — তিন কেজি রাত জেগে, তিন কেজি টেনশনে, এবং বাকি তিন কেজি ওই মুহূর্তে যখন প্রিয় দলটা হারার পর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রতিপক্ষ শিবিরের মানুষ "😂😂😂" পাঠায়। এই তিনটি কেজিই সবচেয়ে কষ্টের।

আমার নিজের পাঁচ সপ্তাহের আবেগের তালিকাটা এরকম: আশা → উত্তেজনা → জয়ের আনন্দ (ব্রাজিল-জাপান, দ্বিতীয় পর্বে বর্ণিত) → পুনরায় আশা → সর্বনাশ (ব্রাজিল-নরওয়ে) → শোক → দার্শনিক মেনে নেওয়া → অন্যের খেলায় নিষ্পৃহ আগ্রহ → বিতর্কে জড়ানো (আর্জেন্টিনা-মিশর) → ক্লান্তি → পাঁচ শহরে দৌড়াদৌড়ি → উত্তেজনা → চূড়ান্ত বিভ্রান্তি (ফাইনালে কাকে চাই?) → স্পেনের গোল → অদ্ভুত আনন্দ। এই পুরো যাত্রাটাকে সাইকোলজির ভাষায় "টার্বুলেন্ট গ্রিফ সাইকেল" বলে। বাংলাদেশে এটাকে বলে বিশ্বকাপ।

চিত্র ১ · পাঁচ সপ্তাহের আবেগ — একটি অবৈজ্ঞানিক কিন্তু সম্পূর্ণ সঠিক গ্রাফ
চিত্র ১ · পাঁচ সপ্তাহের আবেগ — একটি অবৈজ্ঞানিক কিন্তু সম্পূর্ণ সঠিক গ্রাফ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ব্রাজিল — নরওয়ে — এবং শোকের তিনটি স্তর।

নরওয়ে ব্রাজিলকে হারিয়েছে ২-১। মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি। এই বাক্যটা লেখার সময় এখনো একটু থামতে হয়। মনে হয় টাইপো হয়েছে। হয়নি। এটাই ঘটেছে।

ব্রাজিল বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকরা তিনটি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে গেল। প্রথম পর্যায়: অস্বীকার। "রেফারি বিক্রি হয়েছিল।" "হালান্ডের দ্বিতীয় গোলটা অফসাইড ছিল।" "ফিফার ষড়যন্ত্র।" এই পর্যায় চলে প্রায় বারো ঘণ্টা — যার মধ্যে ছয় ঘণ্টা ইউটিউবে রিপ্লে দেখে প্রমাণ খোঁজা হয়। প্রমাণ পাওয়া যায় না, কিন্তু মন শান্ত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়: রাগ। এই পর্যায়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা হোয়াটসঅ্যাপে "ভাই, ব্রাজিল তো..." পর্যন্ত লিখলেই রিড করা বন্ধ হয়ে যায়। তৃতীয় পর্যায়: দার্শনিক মেনে নেওয়া। কেউ একজন বলে — "পেলের সময়েও তো হেরেছিল।" এটা সত্য না হলেও এটা বলা হয়। কারণ এই মুহূর্তে সত্যের চেয়ে সান্ত্বনার দরকার বেশি।

আমার নিজের অনুভূতিটা বলি। সেদিন হিউস্টনে বসে দেখছিলাম। নীল সোয়েটশার্ট পরা ছিলাম — মাঠে না গেলেও অভ্যাস বদলানো ঠিক নয় বলে। কিন্তু এখন বুঝি: নীল সোয়েটশার্টের যাদু শুধু মাঠে কাজ করে। বাড়িতে এটা শুধু একটা নীল কাপড়। পরের বিশ্বকাপে পোশাক গবেষণায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে।

নরওয়ে হালান্ডের দেশ। হালান্ড এখনো ম্যান সিটিতে খেলে — ইংল্যান্ডের ক্লাব। ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে হেরেছে। আর্জেন্টিনা ফাইনালে হেরেছে। অতএব, পরম্পরার বিচারে, নরওয়ে একটু ঘুরে ব্রাজিলের পক্ষেই ছিল। এই যুক্তিটা আমি নিজেই তৈরি করেছি। এটা সম্পূর্ণ অর্থহীন। কিন্তু এটা আমাকে ভালো অনুভব করায়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

ডালাসে পর্তুগাল — এবং ৪১ বছরের একজন মানুষের চোখের জল।

ব্রাজিলের বিদায়ের পর আমি ঘরে বসে থাকিনি। স্পেন বনাম পর্তুগাল ম্যাচ দেখতে স্ত্রী ও বড় মেয়েকে নিয়ে ড্রাইভ করে গেলাম ডালাসে। AT&T স্টেডিয়ামে। হিউস্টন থেকে প্রায় চার ঘণ্টা।

স্ত্রী পর্তুগাল সমর্থক — এবং রোনালদোর একনিষ্ঠ ভক্ত। মেয়েও রোনালদোর ভক্ত। দুইজন একই কারণে গেছে। আমি গেছি কারণ বাড়িতে একা থাকলে চিন্তা হয়। এই তিনটি কারণ যথেষ্ট।

চিত্র ২ · হিউস্টন থেকে ডালাস · তিনটি ভিন্ন কারণ, একটি গাড়ি
চিত্র ২ · হিউস্টন থেকে ডালাস · তিনটি ভিন্ন কারণ, একটি গাড়ি

স্পেন জিতল ১-০, অতিরিক্ত সময়ে। মিকেল মেরিনোর গোল। রোনালদো মাঠ ছাড়ল। ৪১ বছর বয়সে, শেষবারের মতো, বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে। যে মানুষ কাঁদলে পৃথিবীর অর্ধেক মিডিয়া কভার করে, সে সেদিন মাথা নিচু করে হাঁটল। আমার মেয়ে পাশে বসে নীরব ছিল। কিছু মুহূর্ত কথায় বলা যায় না।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আর্জেন্টিনা বনাম মিশর — ২-০ থেকে ৩-২ — এবং বাংলাদেশের তৃতীয় বিভাজন।

আটলান্টায় আর্জেন্টিনা বনাম মিশর। স্কোর ছিল ২-০, মিশরের পক্ষে। বারো মিনিট বাকি। তারপর রোমেরো গোল করল। তারপর মেসি — তার অষ্টম গোল, বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ। তারপর এনজো ফার্নান্দেজ। ৩-২।

সোশ্যাল মিডিয়া তৃতীয়বার বিভক্ত হলো। প্রথমবার বিভক্ত হয়েছিল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়। দ্বিতীয়বার বিভক্ত হয়েছিল ব্রাজিলের বিদায়ের পর — "শোক" বনাম "😂"। এবার বিভক্ত হলো "অলৌকিক প্রত্যাবর্তন" বনাম "রেফারি কেনা"। ব্রাজিল সমর্থকরা, যারা কয়েক দিন আগে নরওয়ের বিপক্ষে নিজেরাই "রেফারি বিক্রি হয়েছে" বলছিল, তারা এবার মিশরের পক্ষ নিল। এই অবস্থানের বিবর্তনটা মনোবিজ্ঞানের জন্য একটি চমৎকার কেস স্টাডি।

চিত্র ৩ · আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের পর · বাংলাদেশ দুই ভাগ — এবার নতুন প্রশ্নে
চিত্র ৩ · আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের পর · বাংলাদেশ দুই ভাগ — এবার নতুন প্রশ্নে

এরপর আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড — কানসাস সিটিতে, অতিরিক্ত সময়ে ৩-১। এই ম্যাচের পর বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা শিবিরের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস পড়লে মনে হয় কাপটা ইতিমধ্যে তারা ব্যক্তিগতভাবে তুলে ধরে এসেছে।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পাঁচ শহরের যাত্রা — বা, একজন মানুষ পাগল হলে কতটা দূর যেতে পারে।

সেমিফাইনাল দুটো। আমি দুটোই সরাসরি দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এটা সহজ ছিল না। প্রথম সেমিফাইনাল ডালাসে ১৪ জুলাই, দ্বিতীয়টা আটলান্টায় ১৫ জুলাই — দুটো শহর, পরপর দুই রাত। মাঝখানে যাতায়াত, হোটেল, খাওয়া, এবং টেক্সাস-জর্জিয়ার মাঝামাঝি কোথাও থেকে হিউস্টনে ফেরার লজিস্টিক্স।

🗺️ ব্যাক-টু-ব্যাক সেমিফাইনাল যাত্রাপথ
হিউস্টন ডালাস ওয়াশিংটন ডিসি আটলান্টা ন্যাশভিল হিউস্টন
সেমি ১: স্পেন ২–০ ফ্রান্স · AT&T স্টেডিয়াম, ডালাস · ১৪ জুলাই · সেমি ২: আর্জেন্টিনা ২–১ ইংল্যান্ড · মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম, আটলান্টা · ১৫ জুলাই · দুটো ম্যাচ, দুটো শহর, মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় — পাঁচ শহর ঘুরে

প্রথম সেমিফাইনাল: স্পেন ২-০ ফ্রান্স। ডালাসে। দুর্দান্ত ম্যাচ। স্পেনের পাসিং ফুটবল বনাম ফ্রান্সের ব্যক্তিগত প্রতিভা — স্পেন জিতল কারণ তারা একটা দল হিসেবে খেলল। এমবাপে, যিনি এই বিশ্বকাপে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন, সেই ম্যাচে তাকে স্পেনের ডিফেন্স যথেষ্ট সম্মান দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল।

দ্বিতীয় সেমিফাইনাল: আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড। আটলান্টায়। আর্জেন্টিনা শেষদিকে এসে জিতল। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা শিবির সেই রাতে যা করল তার পরিমাপ করা সম্ভব নয়। ধরুন — পুরো দেশে যত সাইরেন বাজে, যত আতশবাজি ফোটে, যত চিৎকার হয় — সেটার সম্মিলিত শব্দমাত্রা রাত দুটো থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত টিকে ছিল। এবং বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকরা সেই রাতে মুখে কুলুপ দিয়ে বসে রইল — কারণ এখন একটাই আশা: ফাইনালে আর্জেন্টিনা হারুক।

চিত্র ৪ · দুই দিনে পাঁচ শহর · ব্যাক-টু-ব্যাক সেমিফাইনাল ধরতে · ক্লান্ত কিন্তু সন্তুষ্ট
চিত্র ৪ · দুই দিনে পাঁচ শহর · ব্যাক-টু-ব্যাক সেমিফাইনাল ধরতে · ক্লান্ত কিন্তু সন্তুষ্ট

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ফাইনাল — এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকট।

১৯ জুলাই। মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি। ফাইনাল। স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা।

বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকদের সামনে এক অভূতপূর্ব নৈতিক সংকট: আর্জেন্টিনাকে হারতে দেখতে চাই — কিন্তু স্পেনকে সমর্থন করতে হবে, যে স্পেন পর্তুগালকে হারিয়েছে। রোনালদো ভক্তরা স্পেনকে সমর্থন করতে পারছে না। তবু আর্জেন্টিনা সমর্থন — সে তো কল্পনারও অতীত। ফলে বাংলাদেশের বহু ব্রাজিল সমর্থক এই বিশ্বকাপে প্রথমবার বলল: "আমি শুধু ভালো ফুটবল দেখতে চাই।" এই বাক্যটা জীবনে আগে বলেনি। কারণ আগে প্রয়োজন হয়নি।

এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়লেন। আর্জেন্টিনা ১০ জনে। বাংলাদেশের ব্রাজিল শিবিরে সেই মুহূর্তে যে আনন্দ হয়েছিল — সেটা নিজের দলের গোলের আনন্দ নয়, সেটা প্রতিপক্ষের দুর্ভোগের আনন্দ। এই আনন্দটা ভালো নয়। কিন্তু এটাও মানুষ।

১০৬ মিনিট। ফেরান টোরেস। বেঞ্চ থেকে নেমে, বক্সে বলে পা রেখে, বাম পায়ে গোল। স্পেন ১, আর্জেন্টিনা ০। বিশ্বকাপ শেষ।

এবার একটা পরিসংখ্যান বলি — যা ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান তথ্য। আর্জেন্টিনার ফাইনালে গোলের চেষ্টা: শূন্য। নিয়মিত সময়ে একটাও নয়। অতিরিক্ত সময়ে কর্নার থেকে গিউলিয়ানো সিমিওনের একটি প্রচেষ্টা — যেটা সরাসরি ক্রসবারের উপর দিয়ে গেছে। এটাকে "শট" বলা যায় কিনা তা নিয়েও বিতর্ক আছে। স্পেনের ষোলোটা শট, বারটা গোলে। আর্জেন্টিনার: কার্যত শূন্য। ফাইনালিস্ট হিসেবে এটা বিশ্বকাপ ইতিহাসে একটা রেকর্ড — কোনো ফাইনালিস্ট এতটা নিষ্ক্রিয় ছিল না। ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য এই পরিসংখ্যানটা বলতে হবে — কারণ প্রতিপক্ষের ফাইনালে এই পারফরম্যান্স দেখলে সান্ত্বনা হয়। একটু। অন্তত পরিসংখ্যানে হলেও।

চিত্র ৫ · ফেরান টোরেসের গোলের পর বাংলাদেশ · ১০৬ মিনিট · দুটো অনুভূতি · একটাই দেশ
চিত্র ৫ · ফেরান টোরেসের গোলের পর বাংলাদেশ · ১০৬ মিনিট · দুটো অনুভূতি · একটাই দেশ

সপ্তম পরিচ্ছেদ

সমাপ্তি — উৎসব, বেদনা, এবং পরের চার বছর।

২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হলো। হিসাবটা এরকম: ছয়টা ম্যাচ সরাসরি মাঠে দেখলাম। হিউস্টনে ব্রাজিল-জাপান (Round of 32), নেদারল্যান্ডস-সুইডেন (গ্রুপ পর্ব), ডালাসে স্পেন-পর্তুগাল (Round of 16), কানাডা-মরক্কো (Round of 16 — মরক্কো ৩-০ জিতেছিল), তারপর দুই দিনে পাঁচ শহর ঘুরে সেমিফাইনাল দুটো। আমার দল বিদায় নিল রাউন্ড অফ সিক্সটিনে — নরওয়ের কাছে, যা এখনো বিশ্বাস হয় না। পোশাকের অভিশাপ এবার আরও জটিল হলো: মাঠে নীল সোয়েটশার্টে জিতেছে, বাড়িতে হেরেছে। আগামী বিশ্বকাপে সম্ভবত পোশাক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে হবে।

স্পেন অসাধারণ ফুটবল খেলেছে। আট ম্যাচে মাত্র এক গোল খেয়েছে — বিশ্বকাপের ইতিহাসে চ্যাম্পিয়নের সর্বনিম্ন গোল হজম। ফেরান টোরেস, বেঞ্চ থেকে নেমে ইতিহাস লিখলেন। তাঁর গোলটা সহজ ছিল না — ১০৬ মিনিটে, অতিরিক্ত সময়ে, আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমি মার্টিনেজ সেই রাতে দেওয়ালের মতো ছিলেন। কিন্তু টোরেস পারলেন।

বাংলাদেশে এই ফাইনালের পর যা হলো তা এককথায় বলা যায়: দুই মহাবিশ্বের সংঘর্ষ। এক মহাবিশ্বে আনন্দের বান ডেকেছে — আর্জেন্টিনার হার উদযাপন হচ্ছে। অন্য মহাবিশ্বে গভীর রাতে কান্না, মেসির পোস্টার নামানো, এবং হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে "ফুটবল কখনো ন্যায্য নয়"। দুটো মহাবিশ্বই বাংলাদেশ। দুটোই সত্যি।

আর ব্রাজিল সমর্থকরা? তারা চুপ করে বসে আছে। একটু আনন্দিত — প্রতিপক্ষ হেরেছে। একটু বিষণ্ণ — নিজেরা আগেই গেছে। এই মিশ্র অনুভূতির জন্য বাংলায় কোনো নির্দিষ্ট শব্দ নেই। জার্মানরা বলে "schadenfreude" — অন্যের দুর্ভোগে আনন্দ। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটাও পুরোপুরি মেলে না — কারণ একটু দুঃখও আছে। সম্ভবত এর নাম "বিশ্বকাপ-উত্তর বাংলাদেশি ব্রাজিল সমর্থক সিন্ড্রোম।" অভিধানে এখনো নেই। কিন্তু থাকা উচিত।

২০৩০ বিশ্বকাপ। চার বছর। ব্রাজিল আবার আসবে। পতাকা আবার উঠবে। আরমান ভাই আবার জায়নামাজে বসবে। গ্রুপে আবার ৫,০০০ অপঠিত বার্তা জমবে। এবং আমি — পোশাক নিয়ে আরও গভীর গবেষণা করে — আবার মাঠে যাব। ছয়টা কাপের স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

তিনটি পর্বে একটি বিশ্বকাপ সিরিজ শেষ হলো। প্রথম পর্বে ছিল বাংলাদেশের চিরন্তন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিভাজন। দ্বিতীয় পর্বে ছিল হিউস্টনে সরাসরি জয় দেখা এবং নীল সোয়েটশার্টের আবিষ্কার। এই শেষ পর্বে ছিল পাঁচ সপ্তাহের আবেগের রোলারকোস্টার — ব্রাজিলের বিদায়, রোনালদোর শেষ ম্যাচ, আর্জেন্টিনার বিতর্কিত উত্থান, পাঁচ শহরের দৌড়, এবং ফেরান টোরেসের একটি বাম পায়ের শট যা একটি দেশকে দুই ভাগ করে দিল।

পরের বিশ্বকাপ ২০৩০ সালে। স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, উরুগুয়াই, আর্জেন্টিনা এবং প্যারাগুয়েতে। ব্রাজিল খেলবে। এবং বাংলাদেশ — সেদিনও না খেলেও — পুরো বিশ্বকাপ নিজের মনে করে দেখবে। কারণ এটাই বাংলাদেশ।

— মুস্তাফিজুর রহমান সাজিদ
নিষ্ঠাবান ব্রাজিল সমর্থক · ২০৩০-এর প্রতীক্ষায়