The Lone Guardian of Two Nations
দুই জাতির একমাত্র অভিভাবক
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা হয়তো জানে না — তবে তাদের সবচেয়ে একনিষ্ঠ, সবচেয়ে গোঁড়া, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ সমর্থকরা থাকেন বাংলাদেশে। যে দেশে কেউ কোনোদিন ওই দুই দেশে যাননি, মাঠে খেলা দেখেননি, অথচ প্রতি চার বছরে একবার নিজেদের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছুতেই বিভক্ত। ইলিশ ভাজা না ইলিশ ঝোল, বিরিয়ানিতে আলু থাকবে কি থাকবে না, শীতের সকালে লেপ ছাড়বেন কি ছাড়বেন না — এ নিয়ে তর্ক হয়, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে মিটমাটও হয়। একটি মাত্র বিষয়ে এই জাতি দুই ভাগ হয়ে যায় এবং পুনর্মিলন হয় না। সেটি হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। এবং বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলে না। কখনো খেলেনি। খেলবে কিনা সেই প্রশ্ন তুলতে গেলে লোকে তাকিয়ে থাকে যেন আপনি মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছেন। বিষয়টা অপ্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ খেলুক না খেলুক — ব্রাজিল খেলছে, আর্জেন্টিনা খেলছে, এবং এটুকুই যথেষ্ট।
এই লেখাটি লেখা হচ্ছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে। আমেরিকা, কানাডা, মেক্সিকোতে খেলা হচ্ছে। কিন্তু আসল টুর্নামেন্ট — যেটায় রক্তচাপ সবচেয়ে বেশি ওঠে, ঘুম সবচেয়ে বেশি ভাঙে, সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে — সেটা চলছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীর প্রতিটি চায়ের দোকানে, প্রতিটি ছাদের আড্ডায়, প্রতিটি হোয়াটসঅ্যাপ পারিবারিক গ্রুপে। সেখানে কোনো রেফারি নেই, কোনো সময়সীমা নেই, এবং ফলাফল কখনো মেনে নেওয়া হয় না।
প্রথম পরিচ্ছেদ
উৎপত্তির ইতিহাস, যা কেউ জানে না — কিন্তু সবাই নিশ্চিত জানে।
বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিভাজনের কারণ খুঁজতে গেলে পণ্ডিতরা অনেক তত্ত্ব দেন। কেউ বলেন রঙের কারণ — ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ, আমাদের পতাকার রঙ। এখানে একটু থামা দরকার। আমাদের পতাকার রঙ আসলে লাল-সবুজ। হলুদের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্রাজিল সমর্থকরা এই তত্ত্বটি এত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে এই বিষয়ে তর্ক করতে গেলে তারা আপনার দিকে এমনভাবে তাকান যেন আপনি পদার্থবিজ্ঞানের সাথে তর্ক করছেন। ঠিক আছে, মেনে নিলাম — সবুজ তো আছে! কেউ বলেন ম্যারাডোনার হাতের গোলের পর থেকে আর্জেন্টিনা প্রেম জন্মেছে, কারণ বাঙালি সবসময় যিনি নিয়ম ভাঙেন তার পক্ষে থাকেন। কিন্তু সবচেয়ে সৎ উত্তরটি হলো — কেউ জানে না। এটা শুধু আছে। যেভাবে বন্যা আছে, মশা আছে, পরীক্ষার আগের রাতে কারেন্ট যাওয়া আছে — ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বন্দ্বও আছে। এর উৎস খোঁজা মানে বাতাসকে জিজ্ঞেস করা সে কোথা থেকে এলো।
পরিবারে এই দীক্ষা দেওয়া হয় শিশুকাল থেকে। বাবা ব্রাজিল করেন, ছেলে ব্রাজিল করে। মা আর্জেন্টিনা করেন, মেয়ে আর্জেন্টিনা করে। তবে মাঝেমধ্যে প্রকৃতি বিচিত্র খেলা খেলে — একই পরিবারে এক ভাই হলুদ জার্সি পরেন, অন্য ভাই নীল-সাদা। এরকম পরিবারে বিশ্বকাপের মাসটা কাটে যেন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধ চলছে। ডাইনিং টেবিলে ভদ্রতা বজায় থাকে, কিন্তু চোখে চোখ রাখা হয় না।
সুকুমার রায় বলেছিলেন হ-য-ব-র-ল — এই দেশে সব উলটো। বাংলাদেশে আমরা এক কাঠি এগিয়ে। আমরা এমন দলকে ভালোবাসি যে দলের মাঠ দেখিনি, খেলা দেখতে যাইনি, জাতীয় সংগীতও চিনি না। তবুও প্রতিটি গোলে আমাদের ঘুম ভাঙে এবং প্রতিটি হারে আমাদের বুক ভাঙে। এ এক অদ্ভুত দেশপ্রেম — দেশ যার নিজের নয়।
সিলেটের এক গ্রামে নাকি এক শিশুর নাম রাখা হয়েছিল 'গোলকিপার'। বাবা ব্রাজিল সমর্থক, মা আর্জেন্টিনা — দুজনেই একমত হতে না পেরে এমন একটি নাম বেছেছেন যা পজিশনটাকে সম্মান করে, দেশটাকে নয়। এটাকে কি আপস বলব, নাকি নিরপেক্ষতার সর্বোচ্চ নমুনা? সিলেটের মানুষ এটাকে ব্যবহারিক জ্ঞান বলেন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ — বাংলার নতুন গণতন্ত্র।
সৈয়দ মুজতবা আলী যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো লিখতেন — বাঙালির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হোয়াটসঅ্যাপ পারিবারিক গ্রুপ। এখানে চাচা আছেন, ফুপু আছেন, মামা আছেন যিনি বাস্তবে কোনোদিন কথা বলেন না কিন্তু গ্রুপে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি করে ফরোয়ার্ড করা ছবি পাঠান। এই গ্রুপ সারাবছর মোটামুটি নিরীহ থাকে। বিশ্বকাপ এলে পরিস্থিতি বদলায়।
একটি ব্রাজিল গোলের পরে যা হয় তা নিম্নরূপ: প্রথম তিন সেকেন্ডে পঞ্চাশটি হলুদ বৃত্ত ইমোজি। পরের দশ সেকেন্ডে তিনটি ভয়েস নোট, যার একটিতে কেউ চিৎকার করছেন — কী বলছেন তা অস্পষ্ট কারণ মাইক্রোফোন চাদরে ঢাকা। তারপর একটি ভিডিও — ২০০২ সালে রোনালদোর গোল, যে ভিডিওটি ২০০২ থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে পাঠানো হচ্ছে এবং সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে না। এবং সবশেষে — একজন চাচা, যিনি রাত তিনটায় নোটিফিকেশনের শব্দে ধড়ফড়িয়ে উঠে ফজরের নামাজ মিস হয়ে গেছে ভেবে ওযু করতে গেছেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন — দেশে দেশে ঘুরে যা শিখলাম তা হলো মানুষ সর্বত্র একরকম। বাংলাদেশের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকরা সেই প্রমাণ। তারা যে দেশে যাননি, যার ভাষা বোঝেন না, যার খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না — তাদের জন্য বুক কাঁপান। এই প্রেম যৌক্তিক নয়। কিন্তু বিশ্বের সেরা প্রেমগুলো কখনো যৌক্তিক ছিল না।
আর্জেন্টিনার গোলে একই ঘটনা ঘটে নীল-সাদায়। সাথে যোগ হয় মেসির একটি স্টিকার — এত বিশাল ফাইল সাইজের যে পাঁচটি ফোনের অ্যাপ একসাথে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর একটি বার্তা আসে আর্জেন্টিনা সমর্থক চাচির কাছ থেকে: "দেখলে? বললাম না?" — এই তিনটি শব্দে এত বছরের পুঞ্জিত বিজয়বোধ যে পড়লে মনে হয় তিনি শুধু এই মুহূর্তটির জন্যই বেঁচে ছিলেন।
রাজশাহীতে ২০২২ সালে এক ভদ্রলোক বিশ্বকাপের আগে তার বাড়ি আর্জেন্টিনার নীল-সাদায় রঙ করেছিলেন। তার স্ত্রী — ঘোর ব্রাজিল সমর্থক, যিনি সবকিছুতে নম্র কিন্তু ফুটবলে অটল — বাড়ির তার অংশটা হলুদ-সবুজ করে দিয়েছিলেন। মাঝখান দিয়ে একটা সরল রেখা। তিনটি পত্রিকা ছবি ছাপিয়েছিল। তারা এখনো একসাথে আছেন। বাড়িটা রঙ করা হয়নি। দুটো পরিবারের দুটো ব্যাখ্যা আছে — একদল বলে এটা ভালোবাসার প্রমাণ, অন্যদল বলে এটা একগুঁয়েমির রেকর্ড।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
মেসির আঠারো গোল এবং ব্রাজিল শিবিরের প্রতিক্রিয়া — যা সাহিত্যের উপাদান।
মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত পাঁচ গোল করেছেন, মোট আঠারো বিশ্বকাপ গোল — বিশ্বরেকর্ড। জার্মানির ক্লোজেকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। আর্জেন্টিনা শিবির এই খবরটা এমনভাবে ছড়াচ্ছে যেন তারা ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপারটা ঘটিয়েছেন। প্রতিটি বার্তার শেষে একটা করে 🐐 ইমোজি, এত নিশ্চিন্তে, যেন মেসি তাদেরই চাচাতো ভাই।
ব্রাজিল শিবিরের প্রতিক্রিয়া পড়লে মনে হয় বাংলাদেশে একটি অলিখিত পিএইচডি গবেষণাপত্র লেখা হচ্ছে — বিষয়: "কেন মেসির রেকর্ড আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়।" যুক্তিগুলো নিম্নরূপ: প্রথমত, পেলে একহাজারের বেশি গোল করেছেন, তাহলে আঠারোর কথা কী বলব? দ্বিতীয়ত, এবার ৪৮টা দল খেলছে, আগে ৩২টা খেলত — তাই গোলের তুলনা করা মানেই ভুল। তৃতীয়ত — এবং এটাই সেরা — "ব্রাজিলের রেকর্ড ব্যক্তিগত নয়, দলগত — এটা পরিপক্কতার উচ্চতর নিদর্শন।" এই বাক্যটি মিরপুরের একটি চায়ের দোকানে উচ্চারিত হয়েছিল। দোকানি কিছু বলেননি। তিনি চা ঢেলে দিয়েছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র বলতেন — সত্যবাদিতা মহৎ গুণ, তবে অকালে সত্য বলা বীরের কাজ। বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকরা বীর। তারা মেসির আঠারো গোলের সামনেও বুক ফুলিয়ে বলেন — পেলে বড়। এই সাহস ইতিহাসে বিরল।
ব্রাজিল নিজেদের গ্রুপে শীর্ষে শেষ করেছে। মরক্কোর সাথে ড্র করার পর হাইতিকে ৩-০ ও স্কটল্যান্ডকে ৩-০ হারিয়েছে। শেষ ম্যাচে নেইমার মাঠে নেমেছিলেন। বাংলাদেশের ব্রাজিল শিবির নেইমারকে দেখে যেভাবে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে, সেটা দেখলে মনে হয় চার বছর এই একটি মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করা হয়েছিল। মাঠের ১৪,০০০ কিলোমিটার দূর থেকে।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
লেখকের অবস্থান — স্বচ্ছতার স্বার্থে।
এই রচনার লেখক একজন ব্রাজিল সমর্থক। এটা জানানো দরকার। তবে বিনয়ের সাথে বলি — পাঁচটা বিশ্বকাপ জেতার পর নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করা একটু কঠিন। সুকুমার রায়ের হ-য-ব-র-ল-তে একটি চরিত্র ছিল যে সব প্রশ্নের উত্তর আগেই জানত, প্রশ্ন করার আগেই। পাঁচটা কাপ জেতার পর ব্রাজিল সমর্থকদের সেই দশা। আমরা জানি। প্রমাণ লাগে না। তারপরও মাঠে যাচ্ছি, কারণ সত্যকে সামনে থেকে দেখা ভালো।
ব্রাজিল ২৯ জুন হিউস্টনে জাপানের মুখোমুখি হবে। এই প্রতিবেদক সেদিন মাঠে উপস্থিত থাকবেন — স্টেডিয়ামে, সরাসরি। ব্রাজিলের হলুদ জার্সি পরে, হিউস্টনের সেই মাঠে দাঁড়িয়ে, যে শহরটা আমার দ্বিতীয় বাড়ি। আর্জেন্টিনা শিবির বলবেন — মেসির আঠারো গোল, ২০২২ এর শিরোপা, এর চেয়ে বেশি প্রমাণ কী লাগে? ব্রাজিল শিবির বলবেন — পাঁচটা তারা, একটু গণনা করুন।
এবং ঢাকার কোনো চায়ের দোকানে এখন রাত হয়ে আসছে। দুজন মানুষ বসে আছেন, সামনে ঠান্ডা চা। তর্ক চলছে। দোকানি আলো নেভাতে আসবেন। তারা উঠবেন, রাস্তায় নামবেন, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে তর্ক চালিয়ে যাবেন। কারণ বাংলাদেশে কিছু তর্ক শেষ হওয়ার কথা না। এটা তেমনই একটি।
এটুকুই, আসলে, ফুটবলের মর্মকথা।
ব্রাজিল ২৯ জুন হিউস্টনে জাপানের মুখোমুখি হবে। এই প্রতিবেদক সেদিন স্টেডিয়ামে থাকবেন — সরাসরি মাঠে, গ্যালারিতে বসে, হলুদ জার্সিতে। হিউস্টন আমার দ্বিতীয় বাড়ি, আর সেই শহরে, সেই মাঠে, ব্রাজিলের খেলা দেখা — এটা কাকতালীয় নয়, এটা প্রাপ্য। আর্জেন্টিনা মায়ামিতে খেলবে। বাংলাদেশে উভয় ম্যাচ দেখা হবে — প্রতিটি পাওয়া স্ক্রিনে, প্রতিটি সম্ভব মুহূর্তে, সতেরো কোটি মানুষ যারা ক্লান্ত, উত্তেজিত, ঘুমবঞ্চিত — এবং একটি সেকেন্ডও মিস করতে রাজি নন। এটা ফুটবল ভক্তি নয়। এটা পরিচয়। এবং এই পরিচয়ে বাংলাদেশের কোনো প্রতিযোগী নেই।
দুই শিবিরকে বলি: ম্যাচের পরে চা খান। স্কোর যাই হোক, চায়ের স্বাদ একই থাকবে। তবে ব্রাজিল জিতলে একটু বেশি মিষ্টি লাগে — এটা বৈজ্ঞানিক সত্য।
মুস্তাফিজুর রহমান সাজিদ
নিষ্ঠাবান ব্রাজিল সমর্থক